জিএনএ ডেস্ক, ঢাকা: বাংলাদেশি খেলনায় উচ্চমাত্রার সীসা বা লেড (Pb) পাওয়া গেছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন- এসডো আয়োজিত "টক্সিক প্লে-টাইম: আনকভারিং হেভি মেটালস ইন চিলড্রেনস প্লাস্টিক টয়েস" শীর্ষক রিপোর্ট প্রকাশ করে। ১৭ জুলাই ২০২৫, ঢাকার লালমাটিয়ায় প্রেস ব্রিফিং-এ এই চাঞ্চল্যকর ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
এই গবেষণায় ফিলিপাইন ভিত্তিক সংস্থা, ব্যান টক্সিক্স-এর অত্যাধুনিক এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স (XRF) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ঢাকার চকবাজার, দেশের বৃহত্তম খেলনা বিতরণ কেন্দ্র থেকে সংগৃহীত ৭০টি প্লাস্টিকের খেলনা পরীক্ষা করা হয়েছে। যেখানে উজ্জ্বল রঙের (লাল, হলুদ, কমলা) খেলনা গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলাফলে দেশব্যাপী শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।
রিপোর্টের ফলাফলে দেখা গেছে:
> পরীক্ষিত ৭০টি প্লাস্টিক খেলনার ৭০% এর মধ্যে আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি ভারী ধাতু রয়েছে। ক্রোমিয়াম (Cr) এবং অ্যান্টিমনি (sb) ছিল সবচেয়ে বেশি।
→ কিছু খেলনা আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার চেয়ে ১০ থেকে ৭০ গুণ বেশি পরিমানে উপস্থিত আছে, যেমন:
·
ক্রোমিয়াম: ৪৩০০ পিপিএম (সীমা: ৬০ পিপিএম)
সীসা: ২৩৫০ পিপিএম (সীমা: ৯০ পিপিএম)
পারদ: ১০৮০ পিপিএম (সীমা: ৬০ পিপিএম)
·
ক্যাডমিয়াম: ৬৪০ পিপিএম (সীমা: ৭৫ পিপিএম)
> একটি নীল রঙের খেলনা গাড়িতে (আমান টয় গার্ডেন দ্বারা প্রস্তুতকৃত) পাওয়া গেছে:
·
সীসা: নিরাপদ সীমার ২৬ গুণ (২,৩৫০ পিপিএম)
পারদ: সীমার ১৮ গুণ (১,০৮০ পিপিএম)
ক্রোমিয়াম: সীমার ২৩ গুণ (১,৪০০ পিপিএম)
> উজ্জ্বল রঙের খেলনাগুলো, যা শিশুদের সবচেয়ে আকর্ষণ করে, সেগুলোতে সর্বোচ্চ মাত্রায় ভারী ধাতু পাওয়া গেছে।
২০% খেলনায় বিপজ্জনক মাত্রায় ক্লোরিন ও ব্রোমিনের
রিটার্ডেন্ট ব্যাবহারের প্রমাণ মেলে।
উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা খেলনা প্রস্তুতকালে পিভিসি প্লাস্টিক ও ফ্লেম
“আমান টয় গার্ডেন”, “খোকন প্লাস্টিক প্রোডাক্টস” এবং “শাহজালাল টয়স গ্যালারির” মতো নির্মাতাদের ১০০% খেলনাই নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খেলনাগুলো আমদানিকৃতগুলোর চেয়ে বেশি বিপজ্জনক ।
বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মার্গুব মুর্শেদ বলেন, "একটি জাতি হিসেবে আমরা আমাদের শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারি না। এই ফলাফলগুলো দৈনন্দিন পণ্যে বিষাক্ত পদার্থ নিয়ন্ত্রণে আমাদের ব্যর্থতাকে প্রকাশ করে। সরকারকে অবিলম্বে কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়ন করতে হবে এবং উৎপাদনকারীদের দায়বদ্ধ থাকতে হবে। নিরাপদ খেলনা কোনো বিলাসিতা নয়- এটি বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার ।
এসডোর সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইসর ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, "খেলনা শিশুদের বুদ্ধি বিকাশের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে দেখছি যে সেগুলো ভারী ধাতু ও রাসায়নিকের ব্যবহার অনেক বেশি। আমরা খেলনা নিষিদ্ধ করতে পারি না বা শিশুদের খেলনা থেকে দূরে রাখতে পারি না—খেলনা আনন্দ নিয়ে আসে এবং একটি সুখী শৈশবের জন্য প্রয়োজন। আমাদের অবশ্যই অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে এই খেলনাগুলো বিষমুক্ত হয়, এবং আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আবুল হাশেম বলেন, "এই ফলাফলগুলো আমাদের সবচেয়ে খারাপ আশঙ্কাকে নিশ্চিত করেছে। আমাদের শিশুরা প্রতিদিন খেলনার মাধ্যমে নিউরোটক্সিন ও কার্সিনোজেনের একটি মিশ্রণের সংস্পর্শে আসছে। এ ধরনের উচ্ছমাত্রার ভারী ধাতু শিশুদের বিকাশগত ক্ষতি করছে।"
ডিওই-এর সিনিয়র কেমিস্ট জনাব কাজী সুমন বলেন, "এই ভারী ধাতুগুলো ধীরগতির বিষ হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘমেয়াদী সংস্পর্শে ধীরে ধীরে, তবে গুরুতর—স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, যার মধ্যে স্নায়বিক ক্ষতি অন্যতম। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ESDO-কে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার জন্য আমি সাধুবাদ জানাই, যা নিরাপদ খেলনার জন্য কঠোর নির্দেশিকা প্রণয়নে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।"
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোঃ হেলাল উদ্দিন উল্লেখ করেন "সফল বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে দৃঢ় সমন্বয় প্রয়োজন। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে সহজতর করে।"
বিএসটিআই-র সহকারী পরিচালক মো. মনজুরুল করিম মন্তব্য করেন: "আমরা এই গবেষণার উদ্বেগজনক বিষয়গুলো গভীরভাবে অনুধাবন করেছি এবং ইতোমধ্যেই খেলনার নিরাপত্তা মান নিশ্চিতকরণে একটি নির্দেশিকা প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেছি। এই প্রস্তাবটি শীঘ্রই বিএসটিআই-র কাউন্সিল কমিটিতে পেশ করা হবে। ভারী ধাতুর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে খেলনায় বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি বাধ্যতামূলক এসআরও জারি করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।"
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, “এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়—এটি শিশুদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে এর মান নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছি।"
খেলনাকে বিষমুক্ত যেসব পদক্ষেপ দ্রুত নিতে হবে:
খেলনার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারী ধাতুর ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করে, সুষ্ঠু নির্দেশনা প্রণয়ন করতে হবে, পণ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সঠিক লেবেলিং নিশ্চিত করতে হবে, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় গুলোকে এক সাথে কাজ করতে হবে, যাতে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খেলনা নিশ্চিত হয়, ভোক্তা সতর্কতা ব্যবস্থা এবং উৎপাদনকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং সকল শ্রেণির মানুষের জন্য স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
