মো: সাইফুল আলম সরকার, ঢাকা: ভারত আমাদের শত্রু নয়, প্রতিবেশী। তবে তাদের ফেরেশতা মনে করার কিছু নেই। তারা এদেশকে কলোনি তৈরি করতে চেয়েছিল। তাই হাসিনা সরকারের মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে গেছে। তাই একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসবে হবে বলে মন্তব্য করেন জুলাই বিপ্লব ও বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ বিষয়ক জাতীয় সংলাপের বক্তারা। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে জাতীয় সংলাপের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন তারা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রফেসর ড. শহীদুজ্জামান বলেন, হাসিনা সরকারের সময় যারাই তার বিরুদ্ধে কথা বলেছে কোনো আলোচনায় তাদের ডাকা হতো না। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে একই অবস্থা দেখা যায়। ফলে সঠিক বিষয়গুলো উঠে আসে না। এদেশের কূটনৈতিক বাহিনীরা কে কতটা ভারতের সাথে মানিয়ে চলতে পারে সেই প্রতিযোগীতায় আছে। ভারত সব সময় বাংলাদেশকে শাসন করার চিন্তা করে। তাইতো নিরাপত্তায় তাদের লোকজন সব দিক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে। আওয়ামী লীগ শুধু ফ্যাসিস্ট ছিল না, ভারতীয় সরকার ছিল। হাসিনা এখনো ভারতে বসে দেশের বিরুদ্ধে কথা বলে। যারা বলে আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হবে তাদের আরো ভাবতে হবে। আমরা ৫৫ বছর ধরে পুরোনো পররাষ্ট্রনীতি অবস্থা ধরে রেখেছি। এগুলোকে পরিবর্তন করতে হবে। যদি জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হতো ভারত এদেশে স্থায়ীভাবে অবস্থান নিতো। ভারতের কথা ছিল পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তাই আমাদের এখনই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা দরকার।
তিনি আরো বলেন, ভারত আবার সুযোগ পেলে কখনো হাতছাড়া করবে না। আমাদের সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। এজন্য অনেক সেনা কর্মকর্তাদের তারা আশ্রয় দিয়েছে। আমাদের এখন দীর্ঘ মেয়াদি বন্ধুর দরকার নেই। দেশের প্রয়োজনে শত্রুতা ও মিত্রতা উভয় করতে হবে। ভারতকে দুর্বল করতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে জোড়দার করা জরুরি। এদেশের নিরাপত্তায় যতদিন ভারতের বা মুদীর হস্তক্ষেপ থাকবে ততদিন সমস্যা শেষ হবে না। হাসিনা সরকার তাদের বেশি আপন করে রেখেছিল। ভারত দীর্ঘ দিন ধরে সীমান্ত নিয়ে নানা কথা বললেও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির পর থেকে কিছুটা কমে আসে। ভারত সব সময় বলে তারা স্বাধীনতা দিয়েছে আর বাংলাদেশ তাদের তৈরি। রোহিঙ্গা সমস্যার অন্যতম কারণ আরাকান বুদ্ধিস্টরা। কারণ তারা কখনো চাইছে না রোহিঙ্গারা চলে যাক। আমাদের সেনাবাহিনী ও বিজিত যথেষ্ট প্রশিক্ষিত ও দক্ষ। তবে তাদের কাজে লাগাতে হবে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, এদেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিধিমালায় কোনো দিন গণমাধ্যমের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া আমাদের উচিত ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন এমন প্রভাব বিস্তার করেছে যে, প্রথম সারির গণমাধ্যমও কোনো খবর প্রকাশ করলে অনেকে বিশ্বাস করতে চায় না। সম্প্রতি জুলাই যুদ্ধার হাত বিচ্ছিন্ন হওয়া ঘটনাটি যতটা উঠে এসেছে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ঘটনা ততটা সামনে আসেছি। এর প্রধান লক্ষ হলো ৫ আগস্টের পর থেকে তৈরি হওয়া ঐক্যকে নষ্ট করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিতর্কিত করার জন্য এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে। পুলিশ বলছে এসব কোন কিছুই ঘটেনি। এছাড়া শিক্ষকদের আন্দোলেনর মাঝেও অনেকে এসেছেন পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য।
তিনি আরো বলেন, আমাদের নীতি নির্ধারকদের উদাসীনতার কারণে কিছু দালাল মিডিয়া উঠে এসেছে। বর্তমানের আমরা উপদেষ্টাকে নিয়েও সমালোচনা করলেও কেউ ফেসবুক আইডি নষ্ট করছে না। কিন্তু হাসিনার সময় টেলিভিশনের কিছু মালিক তেল দিয়ে চলতো। অবাক করার বিষয় হলো এখনো ভারতের টাকায় গণমাধ্যম তৈরি হচ্ছে। ভিন দেশিদের টাকায় এদেশে কোনো গণমাধ্যম চলতে পারে না। গণমাধ্যমকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে এখন সত্য উঠে আসে না। ভারত আমাদের নিয়ে নানা গুজব ছড়াচ্ছে কিন্তু আমাদের গণমাধ্যম তোলে ধরেনি। গণমাধ্যমকে উপেক্ষা করে কিছু করতে চাইলে তা সফল হওয়া সম্ভব না।
এসআইপিজি ও এনএসইউ’র সিনিয়র রিসার্চ ফেলো প্রফেসর এম এ রশীদ বলেন, বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চারটি হুমকি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ভারত, রোহিঙ্গা সমস্যা, মিয়ানমার ও দেশের অভ্যন্তরীন হুমকি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিগত সময়ে নিরাপত্তার সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক ছিল না বলে হাসিনা সরকার ত্রাসের রাজত্ব করতে পেরেছে। ভারত আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। তারা প্রতিটি স্তরে তাদের লোকজন তৈরি করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদরা ছিল তাদের প্রধান হাতিয়ান। ভারতের আগ্রাসন থেকে বাঁচতেই জুলাইয়ের আন্দোলন হয়েছে। আন্দোলনকারীরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চেয়েছে। ভারত আমাদের কলোনি হিসাবে দেখেছে সব সময়। আওয়ামী লীগের সব খুনিদের আশ্রয় দিয়েছে তারা। আমাদের দেশে যেসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম করেছে তার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়া উচিত এবং ভারতকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা দরকার। বিডিআর হত্যাকান্ড ঘটিয়ে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ ও দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। মূলত এদেশের মানুষের মনোবল ধ্বংস করতে বিডিআর হত্যা ঘটিয়েছে। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে এবং সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সবাইকে কাজ করতে হবে। আমরা কখনো ভারতের তাবেদারি করবো না। এদেশের স্বাধীনতা সাধারণ মানুষ রক্ষা করবে।
আমজনতার দলের কর্নেল মিয়া মশিউজ্জামান (অব) বলেন, বর্তমানে এমন অবস্থা হয়েছে যে, কে হাসিনর লোক আর কে আমাদের লোক বুঝা সম্ভব হচ্ছে না। যতক্ষণ না আমরা এক হতে পারবো, ততক্ষণ কিছুই করতে পারবো না। হাসিনা দেশের অর্থনীতিকে শেষ করে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ভারতের লোক বসানো হয়েছে গত ১৬ বছরে। তারা আমাদের সব কিছু ধ্বংস করতে পারে। তাই সকল স্তরের জনগণের অংশগ্রহণ থাকা জরুরি। ভারতক আন্তর্জাতিকভাবে থামানোর চেষ্টা করতে হবে। আমরা উন্নত মানের অস্ত্র কেনার চিন্তা করলেও সক্ষমতা নেই। দিন দিন আমাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি আরো বাড়ছে। কারণ আমরা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছি ভারত, চীন, মায়ানমার, আমেরিকার ও রাশিয়ার কাছে। এক্ষেত্রে ভালো কূটনীতির মাধ্যমে আমরাও তাদের থেকে সুবিধা নিতে পারি। সাধারণ লোদের প্রশিক্ষণ দিলে নিজেরাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে পারবে।
এসআইপিজি ও এনএসইউ’র পরিচালক অধ্যাপক এসকে তৌফিক এম হক বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা তৈরি করা জরুরি। আমরা যখনই কোনো নীতিমালা তৈরি করি তা ব্যর্থ হয়, পরে তা ভুলে যাই। নীতিমালার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন করতে হবে সেক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের সংযুক্ত করতে হবে। যদি সমন্বয় না থাকে তাহলে কিছুই কাজে আসবে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে থাকতে হবে। হাসিনার আমলে স্বাধীন কোন পররাষ্ট্র নীতিমালা ছিল না। ভারত ও বিভিন্ন জায়গার নীতিমালা অনুযায়ী চলেছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম পররাষ্ট্র নীতিমালা খুবই জরুরি। জিয়াউর রহমানের সময় অর্থনৈতিক খারাপ থাকলে সার্বভৌমত্ব ঠিক ছিল। তখন ভারত ও মায়ানমারের সাথে আমরা টিকে ছিলাম। কিন্তু হাসিনা এসে অর্থনৈতিকবাবে উন্নত হলেও সার্বভোমত্ব ঠিক রাখতে পরেনি। আমাদের শত্রু চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুও চিহ্নিত করতে হবে।
সংলাপে কর্নেল আশরাফ বলেন, আমরা একটা জায়গায় এসে ঠেকে গেছি যেখানে হাসিনা দেশকে বিশৃঙ্খল অবস্থায় রেখে গেছে। সে সকল ক্ষেত্রে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে গেছে। তাই এদেশে বুঝা যাচ্ছে না কে শত্রু আর কে মিত্র। একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসবে হবে। ভারত আমাদের শত্রু নয়, প্রতিবেশী। তবে তাদের ফেরেশতা মনে করার কিছু নেই। বিগত ১৬ বছরে তারা সব ধ্বংস করেছে। সবাই বুঝে গেছে ভারত ভালো প্রতিবেশী নয়। অবাক করার বিষয় হলো সেনাবাহিনীর মধ্যেও ভারতের প্রতি মায়া আছে। তাই সচেতন থাকতে হবে। সামনে যদি গণভোট হয় তাহলে কোনো খারাপ দল যেন না আসে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আমরা চাইলে ঘাঁটি হিসাবে দাঁড়াতে পারি, সেক্ষেত্রে অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। সবার আগে রাজনীতি নিয়ে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে ভূরাজনীতি বুঝতে হবে। ভারতকে প্রতিবেশী বাদ দিলে মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। আমরা নিরাপত্তা ও গুপ্তচর বিষয়ে সচেতন না। আমাদের দেশে এমন লোকও আছে যারা ইচ্ছে করে ভারতের গুপ্তচর হতে চায়। লক্ষ রাখতে হবে ভারতের কোন কিছু যেন আমাদের দ্বারা কার্যকর না হয়।
আইবিউডাব্লিউএফ এর সেক্রেটারি জেনারেল ড আনোয়ারুল আজিম বলেন, বাংলাদেশে কৃষিই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এ দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। এই সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন এবং ১৮ কোটি মানুষের সার্বিক অগ্রগতির জন্য আমাদের একযোগে কাজ করতে পারলে নির্ধারিত বাজেট যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। যদিও আমি মনে করি, বাজেট আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের চেহারা বদলে যাবে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের চেয়ে উন্নত নয়, তারা শুধু বাস্তবায়নে সফল হয়েছে। আমরাও পারব, যদি আমাদের মানসিকতা ও কাজের মনোভাব ঠিক থাকে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে একসময় ৭,০০০ প্রতিষ্ঠান ছিল, এখন মাত্র ২,২০০ চালু আছে। এ শিল্প থেকে ৮০-৯০ শতাংশ রপ্তানি আয় আসে, অথচ বহু কারখানা বন্ধ। এসব প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রযুক্তি ও ম্যানেজমেন্টে পুনর্গঠন করা গেলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি দুটোই বাড়ানো সম্ভব। এজন্য চাই পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রয়োজনে একটি আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনও বিবেচনা করা যেতে পারে।
আনোয়ারুল আজিম বলেন, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায়ও বড় সমস্যা রয়েছে। মালয়েশিয়া, জাপান বা সৌদি আরবে যেতে অনেকে ৫-৭ লাখ টাকা খরচ করেন, যেখানে প্রকৃতপক্ষে এত ব্যয় হওয়ার কথা নয়। এক শ্রেণির দালালচক্র সাধারণ মানুষকে ঋণ ও সুদের ফাঁদে ফেলে দিচ্ছে। অথচ ইসলামী অর্থনীতি যাকাত, কর্জে হাসানাহ ও নো-প্রফিট ভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা একটি ন্যায্য ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারি।
বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাাড. এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, গত ৫৩-৫৪ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যতটুকু সমৃদ্ধ হওয়া উচিত ছিল, সেটি অর্জিত হয়নি। দুর্নীতি ও অনৈতিকতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত লোভ ও স্বার্থবোধ অনেক কিছুকে দুর্বল করে দেয়। সরকারি কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক নেতারা যদি দেশকে নিজেদের সম্পদ হিসেবেই দেখতে শুরু করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বা প্রশাসনিক কাঠামোই যথেষ্ট নয়। তাই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য ওপর থেকে নৈতিক নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ জরুরি।
তিনি আরো বলেন, গণঅভ্যূত্থানের পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকার ছিল— সংস্কার,বিচার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। সংস্কারের প্রস্তাবে উল্লেখিত কিছু আলোচনা যেমন, প্রধানমন্ত্রীর একই সঙ্গে দলীয় প্রধান ও সরকারের প্রধান থাকা, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোর নির্বাচন বা মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের দায়িত্ব ইত্যাদি, এসব ইস্যুতে ইনস্টিটিউশনালিজম বা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সমাধান আনতে হবে। যাতে কোনো একক দুর্বলতা বা দলীয় আনুগত্যই সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ায় প্রাধান্য না পায়। একই সঙ্গে গণভোট বা রেফারেন্ডামসহ বিভিন্ন বিকল্পও বিবেচনায় আনা হয়েছে। কিন্তু যেকোনো প্রক্রিয়া সফল করতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে সত্যিকার একটি অঙ্গীকার থাকতে হবে, নির্বাচন-প্রক্রিয়া, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় কমিশন বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হবে; আর সেই কর্মপ্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের নিকট সমর্থনযোগ্য হতে হবে।
এহসানুল হক জুবায়ের বলেন, আমাদের সবার দায়িত্ব হচ্ছে, জাতিকে নৈতিকতা, শিক্ষা, দক্ষতা ও সাংস্কৃতিকভাবে গড়ে তোলা। যদি আমরা জনগণের কল্যাণকে প্রথমে রেখে, ব্যক্তিগত স্বার্থচরমে তুলনা না করে এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারি, তখনই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। অন্যথায় আদর্শ নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও সবকিছু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই দুর্নীতিমুক্ত, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য সকলে মিলেই কড়া কমিটমেন্ট নিতে হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রনিক পার্টির সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, রপ্তানি খাত হিসেবে গার্মেন্টসকে আমরা সবচেয়ে বড় সেক্টর হিসেবে গণ্য করি, আর দেশের অর্থ প্রবাহে রেমিট্যান্সও একটি গুরুত্বপূর্ণ কুঁড়ি ধরে আছে। গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্স ছাড়াও ওষুধ বা চামড়াজাত পণ্যের মতো কিছু শিল্প আমরা দেখেছি, কিন্তু এসবেই সমস্যার বীজ লুকিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আমরা প্রথম বড় ব্যর্থতা হিসেবে আমরা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশিলতাকে দেখতে পাই। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যে স্থিতিশীল, ব্যবসা বান্ধব ও শান্তিময় পরিবেশ দরকার—সেটা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। যখন দেশ অস্থিতিশীল থাকে, বাইরের বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ পরিবেশ অনুভব করতে পারে না এবং শিল্পায়ন পিছিয়ে যায়। দ্বিতীয় প্রধান ব্যর্থতা হচ্ছে দুর্নীতি আর লুটপাট। বড় আকারের প্রকল্পের আড়ালে অর্থ তছরুপ ও পাচারের যে ধরণ দেখা যায় সেটা সাধারণ মানুষের উদাসীন চোখে ধরা পড়ত না, কিন্তু রিপোর্ট ও বিশ্লেষণে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য জনগণকে সেবা দেয়া নয়, বরং আর্থিক লুটপাটের সুযোগ তৈরি করাই দেখা যায়। এগুলোকে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে রুখে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের শক্তি হচ্ছে জনশক্তি এটাই আমাদের একটা বড় সৌভাগ্য। গার্মেন্টস খাতেও অর্ডার পাওয়ার কারণ হলো শ্রমিকের সংখ্যা বেশি এবং মেকিং কস্ট তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এটাকে দুর্বলতা ভাবা ঠিক না বরং আমরা যদি শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার দিকে ঝুঁকি বাড়াই, তাহলে এই জনশক্তি আমাদের জন্য বড় সুবিধা হতে পারে। রেমিট্যান্স পাঠানো কর্মীদেরও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিলে, রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন উভয়ই উন্নত হবে।
এনবিআর এর সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদের বলেন, দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকা ২০২৪ সালে বিশ্বের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে বলেছিল, “বাংলাদেশ বিগিংস এগেইন” অর্থাৎ, বাংলাদেশ আবার শুরু করছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের আন্দোলন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন এক অবস্থানে দেশটি পৌঁছেছে, যা নতুন আশার প্রতীক। আমরাও সেই আশার অংশীদার। ৫৩-৫৪ বছরে যা কিছু ঘটেছে, সে আলোচনা ফেলে এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। অতীত নিয়ে সমালোচনা না করে আমাদের কাজ হবে—ভবিষ্যতের জন্য কী করব, কীভাবে আত্মনির্ভর ও স্বনির্ভর হব, কেমন করে আমাদের মানসিকতা ও মনোভাবের পরিবর্তন আনব।
তিনি আরও বলেন, আমাদের অর্থনীতির মূল তিনটি স্তম্ভ হলো—কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত। কৃষি খাত এখনো আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। করোনাকালে যখন শহরগুলো যখন স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখনও গ্রামের কৃষি অর্থনীতি সক্রিয় ছিল। কৃষকরা উৎপাদন অব্যাহত রেখেছিলেন, যার কারণে আমরা টিকে থাকতে পেরেছি। আবার বর্তমানে এই কৃষক, এই অশিক্ষিত গরিব মানুষই রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে। বিদেশে গিয়ে কষ্টের রোজগার করা এই শ্রমিকদের পাঠানো টাকা বড়লোকেরা, শিক্ষিত অভিজাতরা লুট করে নিচ্ছে—এটাই এক বিরাট বৈপরীত্য। যিনি সিঙ্গাপুরে ৪০তম ধনী হয়েছেন, তার সেই টাকার উৎসও এই দেশ থেকে নেওয়া রেমিটেন্সের অর্থ। যদি এই উতসগুলো থেকে আসা টাকাগুলো দেশেই বিনিয়োগ করতে পারতাম, তাহলে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারতাম। আমাদের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শ্রমিকরা দক্ষ হয়ে বিদেশে ভালো কাজ পেতে পারে এবং দেশে ফিরে উদ্যোক্তা হতে পারে।
এনবিআর এর এই সাবেক পরিচালক বলেন, আমাদের জিডিপিতে অনেক সময় বাস্তব উৎপাদন ছাড়াই “অবদান” দখানো হয়, ফলে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত মেলে না। অনেকেই আয় দেখাচ্ছে কিন্তু ট্যাক্স দিচ্ছে না—এতে অর্থনীতিতে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। ২০০৭ সালে মাত্র ৩৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে ৪৭ হাজার কোটি টাকা আহরণ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা হারিয়ে গেছে। যদি আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারি এবং রাজস্ব আহরণের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি, তবে নিজেদের সম্পদ দিয়েই উন্নয়ন সম্ভব। আমরা একদিকে রেমিটেন্সের জন্য হাহাকার করছি, অন্যদিকে আমাদের নিজস্ব চাকরিগুলো বিদেশিদের দিচ্ছি। যদি আমাদের শিক্ষিত তরুণরা দক্ষ হয়ে ওঠে, তাহলে এই অর্থ দেশেই থাকবে। সরকার প্রবাসী শ্রমিকদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্যাশ ইনসেন্টিভ দিচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হিসাব করে দেখা এই অর্থের কতটা সত্যিই প্রবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে আসছে, আর কতটা ধনী শ্রেণির ফেরত আসা টাকা। যদি সবাইকে নির্বিচারে ইনসেন্টিভ দেওয়া হয়, তাহলে প্রকৃত শ্রমিকের প্রাপ্য সুবিধা হারিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে নতুনভাবে শুরু করতে হবে। অতীতের ভুলে না থেকে ভবিষ্যতের জন্য আমাদের চিন্তা করতে হবে। কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, ও রেমিটেন্স সব ক্ষেত্রে সুশাসন, দক্ষতা, এবং আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারি।
